উপকূলের তিন জেলার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কেবিএস’ (খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে। মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তিন জেলার অসংখ্য সড়ক যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি করে এবং বিপুল সংখ্যক সেতু ও কালভার্ট অর্ধেক নির্মাণ করে কাজ মাঝপথে ফেলে রাখা হয়েছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হতে চললেও মাঠের চিত্র এখনো অবিন্যস্ত। এই অসম্পূর্ণ ও বিপজ্জনক কাজগুলো দ্রুত শেষ করা না হলে, তিন জেলার অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলা যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের চরম দুর্ভোগ এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। যাতায়াতের প্রধান পথগুলো কেটে ফেলে রাখায় এবং সেতুগুলো অর্ধেক অবস্থায় ঝুলে থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল এখনই স্থবির হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই জনগুরুত্বপূর্ণ দুর্যোগের মুখেও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট শীর্ষ মহলে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা বলছেন, চলমান কাজগুলো সম্পন্ন না করে যদি এই অবস্থায় প্রকল্পটির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়, তবে সরকারের শত শত কোটি টাকার গণবিনিয়োগ যেমন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাবে, তেমনি টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বপ্নও ধূলিসাৎ হবে।
মাঠের এই করুণ দশা এবং জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে অসম্পূর্ণ কাজগুলো দ্রুত শেষ করার স্বার্থে প্রকল্পের মেয়াদ ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর জোর সুপারিশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো এক আধা-সরকারি (ডিও) পত্রে চলমান স্কিমগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে কেবিএস প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অনুরূপ শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্যও একটি আধা-সরকারি পত্র দিয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, অসম্পূর্ণ কাজ রেখেই যদি প্রকল্পের সমাপ্তি টানা হয়, তবে সাধারণ জনগণ সরকারের এই মেগা উদ্যোগের কোনো সুফল পাবে না। উল্টো সরকারের এত বড় উন্নয়ন কার্যক্রম জনমনে প্রশ্নের মুখে পড়বে। সংসদ সদস্যদের পাঠানো এসব গুরুত্বপূর্ণ পত্রের পর প্রধান প্রকৌশলী নিজে উদ্যোগী হয়ে সেগুলো পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে পাঠান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানান। তবে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. কামরুজ্জামান এই জনগুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাকে বিন্দুমাত্র আমলে নিচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে কেবিএস প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে এক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। সেই বর্ধিত মেয়াদও শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ৩০ জুন। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় প্রকল্প পরিচালক মাত্র ১৬টি চলমান স্কিমের তথ্য উপস্থাপন করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, জুনের মধ্যেই সেগুলোর কাজ শতভাগ শেষ হবে।
অথচ সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় শতাধিক স্কিম এখনও চলমান ও অসম্পূর্ণ অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। খুলনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পিডির কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তাঁর জেলার অন্তত ১৩টি সাব-প্রকল্প কোনোভাবেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়। একইভাবে সাতক্ষীরা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রায় অর্ধশতাধিক চলমান স্কিমের ধীরগতির অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। বাগেরহাট জেলা থেকেও অসম্পূর্ণ কাজের একই ধরনের বিবরণী ও শঙ্কার প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব ও নিখুঁত তথ্যকে সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে পিডি পরিকল্পনা কমিশনে সীমিত ও মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যার মূল উদ্দেশ্য প্রকল্পের প্রকৃত ব্যর্থতার চিত্র আড়াল করা।
প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়েও উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগামী অর্থবছরের জন্য এই প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই বরাদ্দের মধ্য থেকে ২০ কোটি টাকা তাঁর নিজের জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করেছেন। এর ফলে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার চলমান স্কিমগুলোর বাস্তবায়নে অর্থসংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কাজের গতিতে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "প্রকল্প পরিচালক মাঠের কর্মকর্তাদের কিংবা জনপ্রতিনিধিদের মতামতকে কোনো পাত্তাই দেন না। তিনি শুরু থেকেই একতরফা ও একক সিদ্ধান্তে প্রকল্প চালাচ্ছেন।" এক কর্মকর্তা জানান, মাঠের বাস্তবতা আর পিডির টেবিলের তথ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এই সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক স্কিমে কাজের গতি স্থবির হয়ে পড়েছে। শুরু থেকেই পিডি মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষে একগুঁয়ে অবস্থান নেওয়ায় বর্তমানে ঠিকাদার ও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা চরম মানসিক ও প্রশাসনিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
চলমান কাজের একাধিক ঠিকাদার জানান, তাঁরা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, "সময়ের তুলনায় কাজের পরিধি অনেক বেশি বাকি। কাজ শেষ না হলে আমাদের বিল আটকে যাবে। অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতার আতঙ্কে আমরা পিডির কার্যালয়ে যেতেই ভয় পাচ্ছি, সেখানে গেলেই উল্টো চাপ দেওয়া হয়।" আরেকজন বলেন, "যন্ত্রপাতি ও অতিরিক্ত শ্রমিক বাড়িয়ে দিনরাত কাজ করেও এত কম সময়ে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"
সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান এবং খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী উভয়েই বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেছেন, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে যদি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো না হয়, তবে এই বিপুল উন্নয়ন অসম্পূর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে এবং বর্ষায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠবে।
এসব অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার অবমূল্যায়নের বিষয়ে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছিল প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামানের কাছে। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কেবল বলেন, "আমি এখানে থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।" এরপর প্রকল্পের বাস্তব পরিস্থিতি ও খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনভোগান্তি নিয়ে আরও প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।
